হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের বাইরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বকারী কার্যালয়গুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং আফ্রিকা মহাদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইমাম হাদি (আ.) বিশেষায়িত কেন্দ্রে ‘সিয়েরা লিওন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে পরিচিতি: ইতিহাস থেকে সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, পরিবার এবং ধর্ম ও মতবাদ’ শীর্ষক একটি বিশেষায়িত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সভায় সিয়েরা লিওনে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা আবেদিন সিয়াহাত অনলাইনে বক্তব্য দেন। সাংস্কৃতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে তাঁর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং পশ্চিম আফ্রিকা সম্পর্কে তাঁর বিশেষায়িত গবেষণার ভিত্তিতে তিনি সিয়েরা লিওনের বিভিন্ন দিকের একটি সামগ্রিক, বিশ্লেষণধর্মী ও বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেন।
ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ সমীকরণে আফ্রিকা মহাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, আফ্রিকা আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ একটি মহাদেশ নয়; বরং অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তাই আফ্রিকার দেশগুলো সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও সঠিক জ্ঞান অর্জন ইরানি গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের জন্য শুধু গবেষণার আগ্রহের বিষয় নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পশ্চিম আফ্রিকার পরিবর্তন ও রূপান্তর অধ্যয়নের জন্য সিয়েরা লিওন একটি উপযুক্ত উদাহরণ। সিয়েরা লিওনকে জানা মানে পশ্চিম আফ্রিকার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি অংশকে জানা। অতীতের নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশটি বর্তমানে পুনর্গঠন, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের পথে রয়েছে এবং সাংস্কৃতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
সিয়াহাত সিয়েরা লিওনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আদিবাসী বসতি গড়ে ওঠার সময়কাল থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের আগমন, দাস বাণিজ্য, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, স্বাধীনতা, গৃহযুদ্ধ এবং দেশটির পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দেশটির ঐতিহাসিক পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারকারী কারণগুলো বিশ্লেষণ করে সংকট অতিক্রমের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয় ও স্থানীয় সংস্কৃতির ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি সিয়েরা লিওনের সাংস্কৃতিক কাঠামোও তুলে ধরেন। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ও সামাজিক ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করে তিনি এই বৈচিত্র্যকে দেশটির অন্যতম সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেন।
ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বলেন, সিয়েরা লিওনের সমাজের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো সহাবস্থান ও সহনশীলতার সংস্কৃতি। জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও দেশটির মানুষ বহু জাতীয় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। এই ঐক্য ও সম্প্রীতির মানসিকতাই তাঁদের মূল্যবান সামাজিক সম্পদ।
এরপর তিনি সিয়েরা লিওনের রাজনৈতিক কাঠামো ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেশটির শাসনব্যবস্থা, তিনটি সাংবিধানিক অঙ্গ, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী ব্যবস্থা, নাগরিক সমাজের ভূমিকা এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন, পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (ECOWAS), ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (OIC) ও জাতিসংঘে সিয়েরা লিওনের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সিয়েরা লিওনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে সিয়াহাত দেশটির খনিজ সম্পদ-যার মধ্যে হীরা, স্বর্ণ, বক্সাইট ও লৌহ আকরিক রয়েছে-এবং কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সিয়েরা লিওন শুধু বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী নয়; দেশটির তরুণ মানবসম্পদ এবং বিনিয়োগের বিভিন্ন সুযোগও রয়েছে। এসব সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের পথ তৈরি করতে পারে।
ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা দেশটির সামাজিক পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করেন। তিনি পরিবার কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থা, নারীদের অবস্থা, তরুণদের পরিস্থিতি, মানব উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ, বেসরকারি ও নাগরিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা এবং সিয়েরা লিওনের সমাজের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি পরিবারকে সিয়েরা লিওনের সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সিয়েরা লিওনের সমাজ অর্থনৈতিক সমস্যা ও কিছু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হলেও পরিবার এখনো শিক্ষা ও মূল্যবোধ গঠন, সামাজিক সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ হস্তান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিয়াহাত উল্লেখ করেন যে সিয়েরা লিওনের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। তিনি দেশটির ইসলামী মাজহাব, ধর্মীয় কেন্দ্র, ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম সম্পর্কে পরিচিতি তুলে ধরেন। পাশাপাশি মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে বিদ্যমান সহাবস্থানকে সিয়েরা লিওনের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, সিয়েরা লিওনের অন্যতম মূল্যবান সামাজিক সম্পদ হলো বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি। মুসলিম ও খ্রিস্টানরা বহু ক্ষেত্রে পাশাপাশি বসবাস ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিজ্ঞতা আন্তধর্মীয় সংলাপ এবং সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি মূল্যবান সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা শিক্ষার্থীদের আফ্রিকা-অধ্যয়নের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজ অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এমন গবেষকের বেশি প্রয়োজন, যারা আফ্রিকাকে কাছ থেকে, বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং প্রচলিত গতানুগতিক ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে জানবেন। আফ্রিকার সঙ্গে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এমন দক্ষ, সচেতন ও বিশেষজ্ঞ জনবল গড়ে তোলার ওপর নির্ভরশীল।
আপনার কমেন্ট